নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ সকাল ১০:৪৮:৩৬
ড্রোন আর ন্যানো প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে কৃষির ছবি: পাংশার মাঠে সূক্ষ্ম কৃষির নতুন দিগন্ত
পিঠে ভারী স্প্রে-যন্ত্র। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্ষেতের আল ধরে হাঁটা। গায়ে-মুখে ঝরে পড়া কীটনাশকের ফোঁটা। বাংলাদেশের কৃষকের এই চিরচেনা ছবিটাই হয়তো বদলে যেতে চলেছে।
সম্প্রতি রাজবাড়ীর পাংশার এক মাঠে শতাধিক কৃষক দেখলেন এক নতুন দৃশ্য — মাথার ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ শব্দে উড়ে যাচ্ছে এক অত্যাধুনিক ড্রোন, নিচে নেমে আসছে সার ও কীটনাশকের কুয়াশা-সদৃশ ফোঁটা। যে কাজে একজন কৃষকের লাগত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ড্রোন তা শেষ করছে মিনিট পাঁচেকে — কৃষকের শরীরে রাসায়নিকের একটি ফোঁটাও পড়ছে না।
পাংশা উপজেলা প্রশাসন এবং এগ্রি-ফিনটেক প্রতিষ্ঠান উইগ্রো টেকনোলজিস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত "উইগ্রো বারি-সবুজ কৃষি ড্রোন ও ন্যানো প্রযুক্তি পারফরম্যান্স ডেমো" অনুষ্ঠানে এই দৃশ্যের সাক্ষী হলেন স্থানীয় কৃষকেরা।
পরীক্ষায় ব্যবহৃত ন্যানো ইউরিয়াটি দেশীয় গবেষণারই ফসল। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ন্যাম ল্যাবের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. জাবেদ হোসেন খান ও তাঁর দল প্রচলিত ইউরিয়ার কণাকে ন্যানো আকারে রূপান্তর করে তরল রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমেদ খায়রুল হাসানের নেতৃত্বে এই ন্যানো ইউরিয়াকে বায়োচারের কার্বন কোটিং দিয়ে সরাসরি জমিতে প্রয়োগের পদ্ধতি মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে — এই কোটিং গাছের প্রয়োজন অনুসারে ধীরে ধীরে সার গ্রহণ উপযোগী করে অপচয় কমিয়ে আনছে।
মাত্র ১ লিটার ন্যানো ইউরিয়া প্রায় ৪৫ কেজি প্রচলিত ইউরিয়ার সমান কাজ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ফলন বেড়েছে গড়ে ১৪ শতাংশের বেশি, অথচ সার লেগেছে প্রায় অর্ধেক। কিন্তু গবেষণাগারের এই উদ্ভাবন কৃষকের জমিতে পৌঁছাবে কীভাবে — সেই প্রশ্নের উত্তর দিতেই মাঠে নেমেছে উইগ্রো।
দেশের সেরা গবেষকদের ল্যাব, সরকারি প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং প্রান্তিক কৃষকের জমি — এই বিচ্ছিন্ন বিন্দুগুলোকে একসুতোয় গাঁথার কাজটি করেছে উইগ্রো। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ড্রোন, সয়েল সেন্সর ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে দেশের প্রায় ৩০ হাজার কৃষকের সঙ্গে।
অনুষ্ঠানে উইগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, "বাংলাদেশের কৃষক যুগ যুগ ধরে পিঠে স্প্রেয়ার বেঁধে বিষাক্ত কীটনাশকের সরাসরি সংস্পর্শে থেকেছেন; ফলাফল ক্যান্সারসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ। ড্রোনে স্প্রে হলে কৃষকের শরীরে রাসায়নিকের একটি ফোঁটাও পড়ে না, ঘণ্টার পর ঘণ্টার কাজ শেষ হয় মিনিটে, আর ন্যানো ইউরিয়ার কারণে সারের খরচ নেমে আসে প্রায় এক দশমাংশে — অথচ ফলন বাড়ে। যে প্রযুক্তি একসময় ছিল শুধু বড় খামারের নাগালে, উইগ্রো সেটাকেই পৌঁছে দিচ্ছে দেশের প্রতিটি ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয় — এটি একটি সামাজিক রূপান্তরের সম্ভাবনাও বহন করছে। কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে দেশের বহু প্রান্তিক কৃষক ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন; ড্রোন প্রয়োগে সেই সংস্পর্শই থাকে না। এক বিঘা জমিতে স্প্রে দিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে দীর্ঘ সময় লাগে, ড্রোনে তা সম্পন্ন হয় মাত্র পাঁচ মিনিটে, খরচ নেমে আসে প্রায় ১৫০ টাকায়। আর ড্রোন কীটনাশক বা সারের ফোঁটা ফেলে ঠিক যেখানে দরকার, ঠিক যতটুকু দরকার — অপচয় কার্যত শূন্যের কোঠায়। কৃষি গবেষকদের ভাষায়, এটিই "প্রিসিশন এগ্রিকালচার" বা সূক্ষ্ম কৃষি। স্থানীয় কৃষকদের প্রতিক্রিয়াও আশাব্যঞ্জক।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা পারভীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. শহিদুল ইসলাম এবং পাংশা উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন পাংশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রিফাতুল হক। অতিথিরা মাঠে দাঁড়িয়ে ড্রোনের প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেশীয় গবেষকের উদ্ভাবন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রান্তিক কৃষকের জমি — এই তিন বিন্দুর সম্মিলনকে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লবের পথে একটি বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। অনুষ্ঠানে উইগ্রো টেকনোলজিসের হেড অব বিজনেস এক্সপানশন অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি কৃষিবিদ শাকিল আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।
পাংশার এই এক বিকেলের মাঠ-প্রদর্শনী হয়তো ছোট একটি ঘটনা। কিন্তু উড়তে থাকা ড্রোনের নিচে যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা জানেন — বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ সম্ভবত এভাবেই লেখা হবে।