হীরা আহমেদ জাকির, নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ০৪:৪৩:৪০
ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৃত্যুফাঁদে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নিয়ন্ত্রণহীন ইটভাটার বিস্তারে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্য। বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে জেলায় ১৪৭টি ইটভাটা থাকলেও এর মধ্যে ৮৬টিরই নেই নবায়ন, পরিবেশ ছাড়পত্র বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন। অনেক ভাটার নেই বিএসটিআই সনদ, কৃষি ও পরিবেশগত ছাড়পত্র; আবার অনেকেই মানছেন না প্রচলিত আইন ও শর্তাবলী।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় চোখ মেললেই দেখা যায় ইটভাটা। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, হাট-বাজার এবং জনবসতিপূর্ণ গ্রামের ভেতর কৃষিজমির মাঝেই গড়ে তোলা হয়েছে এসব ভাটা, যা স্থানীয়দের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার কারণে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালাপোড়া এবং চর্মরোগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পার্টিকুলেট ম্যাটার শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ভাটার আশপাশে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশ ও কৃষিক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। ধান, নারিকেল, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলগাছ ঠিকমতো বৃদ্ধি পাচ্ছে না। অন্যদিকে অবৈধভাবে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়ায় আবাদি জমি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভেকু দিয়ে গভীর গর্ত করায় অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের কারণে মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
জেলায় মোট ১৪৭টি ইটভাটার মধ্যে ৬১টি বৈধ এবং ৮৬টি অবৈধ। সদর উপজেলায় ৪টি বৈধ ও ৮টি অবৈধ, সরাইলে ১৯টি বৈধ ও ১৮টি অবৈধ, আখাউড়ায় ৩টি বৈধ ও ২টি অবৈধ, আশুগঞ্জে ৭টি বৈধ ও ২টি অবৈধ, কসবায় ১টি বৈধ ও ৫টি অবৈধ, নবীনগরে ১০টি বৈধ ও ১৮টি অবৈধ, নাসিরনগরে ৮টি বৈধ ও ১৪টি অবৈধ, বাঞ্ছারামপুরে ৩টি বৈধ ও ৩টি অবৈধ এবং বিজয়নগরে ৬টি বৈধ ও ১৬টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯) অনুযায়ী লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একইভাবে কৃষিজমি, বনভূমি, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ভাটা স্থাপন করা যাবে না। আইন লঙ্ঘন করলে জেল ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু সাইদ বলেন, “যাদের লাইসেন্স নেই, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে। একসঙ্গে সবগুলোতে অভিযান চালানো সম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে সব ভাটায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া কার্যালয়ের উপপরিচালক নাজিম হোসেন শেখ জানান, নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের মতে, অবৈধ ইটভাটা বন্ধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।