পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে ৩০ গ্রাম পানিবন্দি: ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ধানক্ষেত
মৌলভীবাজারে পাহাড়ি ঢলে গোগালিছড়া ও বালিয়াছড়ার বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০ গ্রাম প্লাবিত ও ৬শ হেক্টর বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাত থেকে মুষলদারে বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলার মানুষের এসব ক্ষতি হয়েছে।কুলাউড়া উপজেলার গোগালি ছড়া বাঁধ ভাঙনে কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের বাগাজুরা, হাসনপুর, শ্রীপুর, করেরগ্রাম, মিনারমহল, সৈয়দপুর,গাজিপুর, পুরন্দপুর,হরিপুর, বড়কাপন এবং জয়চন্ডী ইউনিয়নের দানাপুর, কামারকান্দি লামাগাঁও গ্রামে ১শ হেক্টর আউশক্ষেত, বোরো ধান, আউশের বীজ তলা, শতাধিক পুকুর তলিয়ে মাছ বের হয়ে গেছে। কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন সদর ও জয়চন্ডি ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।অপরদিকে, কমলগঞ্জ উপজেলার উত্তর বালিগাঁও গ্রামে বালিয়াছড়ার পানি প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫শ হেক্টর বোরো ফসলের মাঠ। ছড়ার একটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং আরও তিনটি পয়েন্ট দিয়ে পানি উপচে পড়ার ফলে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ধান কাটার আগ মুহূর্তে চোখের সামনে সোনালি ফসল তলিয়ে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এলাকার শত শত কৃষক।উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বালিয়াছড়ার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির তীব্র চাপে ছড়ার একটি অংশ ভেঙে পানি ঢুকছে ফসলি জমিতে। এছাড়া পাড় নিচু হওয়ায় ৩টি স্থান দিয়ে পানি উপচে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা এখন প্লাবিত। বর্তমানে উত্তর বালিগাঁও গ্রামের অধিকাংশ জমি পানির নিচে রয়েছে। এদিকে রাজনগর উপজেলায় টানা দুদিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাউয়াদীঘি হাওরসহ বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অকাল বন্যার এ পরিস্থিতিতে আধাপাকা বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো কৃষক। শ্রমিক সংকট, অস্বাভাবিক মজুরি বৃদ্ধি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।কাউয়াদীঘি হাওরের বেতাগুঞ্জা গ্রামের কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে যারা কাজ করছেন, তাদের অর্ধেক সময় কাজ করলেও পূর্ণ দিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, একজন শ্রমিকের জন্য প্রতিদিন ১,০০০ থেকে ১,১০০ টাকা ব্যয় হলেও বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।ক্ষতিগ্রস্ত রাম চন্দ্র পাল, জমির মিয়া, রবি দত্ত জানান, হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা এবার চাষাবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে তারা নিঃস্ব। অনেক কৃষককে বুক সমান পানিতে নেমে আধা-পাকা ধান কাটার নিরর্থক চেষ্টা করতে দেখা গেছে।কৃষক সাইফুল মিয়া বলেন, কষ্ট করে ধান কেটে আনার পরও রোদের অভাবে তা শুকানো যাচ্ছে না। ভেজা ধান স্তূপ করে রাখায় তাতে চারা গজিয়ে যাচ্ছে, ফলে তা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।কমলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোছা. আমিনা বেগম জানান, ছড়াটি দীর্ঘদিন খনন না করায় তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, যা এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। আমরা বাঁধটি বারবার মেরামত করলেও ছড়া খনন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না, ফলে প্রতি বছরই এটি ভেঙে যায়। এই বছর আমরা কমলগঞ্জ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বালিয়াছড়া খননের একটি প্রকল্প উপজেলা পরিষদে পাঠিয়েছি। এটি বাস্তবায়ন হলে কৃষকরা স্থায়ী মুক্তি পাবে।এ ব্যাপারে কুলাউড়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাদিম মাহমুদ রাজু জানান, বাঁধ ভেঙে সদর ইউনিয়নের গাজিপুর গ্রামে ২০ বিঘা বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।ভারপ্রাপ্ত ইউপ চেয়ারম্যান আব্দুশ শহীদ জানান, গোগালি ছড়া ভাঙনে এ ইউনিয়ন কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মৎস্য খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।কৃষি কর্মকর্তা অশ্বিনী কুমার সিংহ বলেন, পাহাড়ি ঢলে বালিয়াছড়ার পানি উপচে ও বাঁধ ভেঙে প্রায় ১ হাজার হেক্টর বোরো ধান বর্তমানে প্লাবিত হয়েছে। ফসলের এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন জানান, সদর ও জয়চন্ডি ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। পাহাড়ি ঢলে এ উপজেলার ১০-১৫টি গ্রামে পানি প্রবেশ করে। কয়েক জায়গায় রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আকষ্মিক ঢলে পানিবন্দি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে।