স্থানীয় নির্বাচন: আওয়ামী সমর্থকদের রাজনীতির সুযোগ
চলতি বছরের অক্টোবরে হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সব নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে ঘোষণা করা হবে তফসিল। প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত হবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন। এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসির রোডম্যাপের কথা জানান।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা দিতে হচ্ছে প্রশাসক নিয়োগের মধ্য দিয়ে। এতে নাগরিক সেবা পেতে নানা ত্রুটির কথা উঠে আসছে। তাই নাগরিক সেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্ধারণ করার পরিকল্পনা ইসির। একসাথে সব জায়গায় নির্বাচন পরিচালনা করার বিড়ম্বনা এড়াতে ধাপে ধাপে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে সীমানা নির্ধারণ, আইন ও বিধিমালা সংশোধন, আচরণবিধি চূড়ান্ত করা এবং সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনী বিধিমালায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও নিরপেক্ষ, সাশ্রয়ী ও সহিংসতামুক্ত করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাগজের পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হচ্ছে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিধান। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়ারও সুযোগ থাকছে না। কোনো দলীয় প্রতীক না থাকায় নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে। নির্দলীয় প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার সুযোগটি নিতে পারে রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের সমর্থকরা।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন কারাগারে বন্দি থাকলেও দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নিষিদ্ধ করে দেয়া হয় ছাত্রলীগকে। আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনে পরিণত হয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দল, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ। এরপর থেকে আওয়ামী লীগ কিংবা এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।
বিগত দুবছর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করার সাহস করেনি নেতাকর্মীরা। তবে বিভিন্ন সময় গুটি কয়েক নেতাকর্মী নিয়ে চোরাগুপ্তা কয়েক মিনিটের মিছিল করতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ফুটেজ দেখে এইসব নেতাকর্মীদের অনেককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গত ৯ জুন, সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচনসংক্রান্ত শর্তাবলি পূরণ করতে পারলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে সমস্যা নেই। এ বিষয়ে সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্নের জবাবে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, একজন নির্দলীয় ব্যক্তি প্রার্থী হলেন, কিন্তু প্রচারে আওয়ামী লীগ বা তাঁদের যা যা বলার সেটা বলেন, সেটা সমস্যা হবে। এর বাইরে নির্দলীয় ব্যক্তি, তাঁর যে ক্রাইটেরিয়া আছে নির্বাচনটি করার জন্য, সেটা যদি পূরণ করতে পারেন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটির নাম বা পদ-পদবি ব্যবহার করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক বা নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দল বা দলীয় প্রতীক অংশ নেয় না। তাই আইনি বাধা না থাকলে যেকোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র বা অদলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তবে যারা আওয়ামী আমলে এলাকায় নানা ধরনের কুকীর্তি, অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল, নিশ্চয়ই সেটি আইনের আওতায় আসতে হবে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় কেউ স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দৌড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা থাকতে পারবেন কিনা এমন প্রশ্ন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। কিন্তু সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থকদের অংশগ্রহণ নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য হলো, গণহত্যা ও অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনোভাবেই স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বা রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ নেই। এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদের মতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনোভাবেই অংশ নিতে পারে না। এনসিপি নেতাদের মতে, ফ্যাসিবাদী তকমা নিয়ে পতন হওয়া এই দলের নেতাকর্মীরা কোনো নির্বাচনে অংশ নিলে তা হবে তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় নেবে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যে কেউ ভোটে অংশ নিতে পারবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগের নাম, প্রতীক বা স্লোগান ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে আইনগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। তবে দলীয় প্রতীক বা স্লোগান ব্যবহার না করে ব্যক্তি ইমেজে নির্বাচন করা এবং তৃণমূলের সমর্থন ধরে রাখা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।