শফিকুজ্জামান সোহেল, গঙ্গাচড়া, রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ দুপুর ০১:৫৯:৪৪
পদ্মা ব্যারাজে গতি, তিস্তা এখনো প্রতীক্ষায়
তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার প্রতীক। নদীভাঙন, খরা, বন্যা ও পানিসংকটে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে থাকা তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ছিল বড় এক আশার নাম। কিন্তু বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, সমীক্ষা ও আলোচনা চললেও এখনো প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি নেই। এরই মধ্যে দ্রুত একনেক অনুমোদন পেয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। ফলে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তিস্তা কি আবারও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই আটকে যাচ্ছে?
গত এক দশকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এসেছে নানা প্রতিশ্রুতি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা এগোলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। পরে বিএনপিও ক্ষমতায় এলে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয়। নির্বাচনী জনসভা, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলন-সমাবেশে বারবার উঠে আসে তিস্তার বিষয়টি। চীনের আগ্রহ, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন আশার সঞ্চার হলেও এখনো প্রকল্পটির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন—পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প অনুমোদন পেলেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেন এখনো অনিশ্চয়তায়?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের পর টানা তিন বছর তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সমীক্ষা চালায় চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন। শুরু থেকেই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখায় চীন। তবে ভারতের আপত্তির কারণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সে পথে এগোয়নি। পরে সরকারিভাবে জানানো হয়, তিস্তা প্রকল্পে ভারত কাজ করবে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবারও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে চীনের রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায়ও তিস্তা ছিল অন্যতম আলোচিত ইস্যু। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেন। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর ও নীলফামারীর নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, “বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।”
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে “জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই” কর্মসূচির সমাপনী জনসমাবেশেও তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একইভাবে চলতি বছরের ১১ মে লালমনিরহাটে এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সরকার চীনের সহায়তায় দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করতে চায়।
তিস্তা ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনেও জোরালো বক্তব্য এসেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে “জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই” স্লোগানে তিস্তা নদীর দুই পাড়জুড়ে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করেন। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই প্রকল্পের কাজ শুরুর দাবি জানানো হয় সেসব কর্মসূচি থেকে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রংপুরে নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে প্রথম কোদালটি তিস্তাপাড়েই বসানো হবে।” পরে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের জনসভায় তিনি ঘোষণা দেন, “সব ধরনের ভূ-রাজনৈতিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।”
তবে এত রাজনৈতিক আশ্বাসের পরও তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তিস্তা ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল হাদী বলেন, “তিস্তাপাড়ের মানুষ বছরের পর বছর শুধু আশ্বাস শুনে আসছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন নেই। নদীভাঙন, খরা আর বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করেই মানুষের জীবন কাটছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যেত।”
রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজী বলেন, সংসদে দেওয়া তাঁর প্রথম বক্তব্যেই তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, “তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি এখন আর শুধু আঞ্চলিক ইস্যু নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “বিদেশি অর্থায়নের জন্য অপেক্ষা না করে নিজস্ব অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এটি কঠিন নয়।”
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, একনেক সভাকে ঘিরে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তিস্তার বদলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন তাদের হতাশ করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাতক পাখির মতো একনেক সভার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম এবার হয়তো তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। তিস্তার বদলে পদ্মা ব্যারাজের বাজেট এলো। তবে আমরা পদ্মা ব্যারাজের বিরোধী নই।”
তিনি আরও বলেন, “পদ্মা নিয়ে বড় প্রকল্প হতে পারে, তাহলে তিস্তা কেন নয়? কেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ বারবার বৈষম্যের শিকার হবে?”
তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিস্তা কি আবারও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবায়নের পথে এগোবে? বছরের পর বছর আশ্বাস, সমীক্ষা ও আলোচনার পরও প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে উত্তরাঞ্চলে। এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, তিস্তাকে আর কেবল নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে ব্যবহার না করে দ্রুত মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করা হোক। কারণ, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন, কৃষি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অস্তিত্বের প্রশ্ন।