সাঈদ উজ্জ্বল
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ রাত ০৯:০৪:১৮
মধ্যপাড়ায় লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি: প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বাঁচাতে পদক্ষেপ জরুরি
আমাদের সবুজ শ্যামল অঞ্চল আজ এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত কে.জি এন্টারপ্রাইজ নামের লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি স্থানীয় মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের মানুষ আজ আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। কারণ তারা বুঝতে পারছেন, এই কারখানা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এক নীরব বিষের গজব উৎপাদন কারখানা।
লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং শিল্প পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে “রেড ক্যাটাগরি”ভুক্ত শিল্প হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানা বাধ্যতামূলক। পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, কারখানা স্থাপনের পূর্বে অবস্থানগত ছাড়পত্র (Site Clearance), পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সমীক্ষা (EIA Report), স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ, পরিবেশ দূষণের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র (NOC) সংগ্রহ করা আবশ্যক।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মধ্যপাড়ায় স্থাপিত এই কারখানার ক্ষেত্রে এসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কিছুই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপস্থিতিতে কোনো জনমত যাচাই হয়নি, এলাকাবাসীকে প্রকল্পের ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রকৃত মতামতও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এমন একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ কারখানা জনবসতির এত কাছে স্থাপনের অনুমতি পেল?
লেড দূষণ পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ বিষাক্ত দূষণের একটি। ব্যাটারি রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় বাতাসে সীসার কণা ছড়িয়ে পড়ে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হওয়া, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। একইসাথে মাটি ও পানিদূষণের কারণে কৃষিজমি, মাছ, গবাদিপশু এবং পুরো জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে, মানুষের মধ্যে এখন একটাই দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে: এই কারখানা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কারণ মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাঁচার নিশ্চয়তা চায়।
এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের পরামর্শে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ধারা ৮(১)-এর আওতায় প্রতিকার চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বরাবরও অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলন এখন আবেগের জায়গা থেকে বেরিয়ে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পথে প্রবেশ করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশাসন কী করবে?
আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও যদি কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে তা হবে জনগণের জীবন ও পরিবেশের প্রতি চরম অবহেলা। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অনেক পরিবেশবিধ্বংসী কারখানা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নীরবতা কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর টিকে থাকে। আইনের ফাঁক-ফোকর দেখিয়ে কিংবা দীর্ঘসূত্রতার অজুহাতে জনগণকে “হাইকোর্ট দেখানো” কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না।
সরকারকে মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কখনো মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে হতে পারে না। একটি গ্রামের বাতাস, পানি, মাটি এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে বিষাক্ত করে তোলা কোনো শিল্পায়ন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে অপরাধ।
প্রাণ বাঁচাতে, প্রকৃতি বাঁচাতে, এই বিষাক্ত লেড এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি বন্ধ করুন। একইসাথে ইতোমধ্যে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।
লেখক: কবি ও রাজনীতিবিদ