জাহাঙ্গীর আলম,নেত্রকোণা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬ রাত ১০:৪৯:০৫
বাড়িতে বললে ফেল করিয়ে দেব—বোতল দিয়ে পিটিয়ে ছাত্রকে অজ্ঞান
নেত্রকোণার খালিয়াজুরীতে এক সহকারী শিক্ষকের নির্মম মারধরের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে মুগ্ধ তালুকদার (১১) নামে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের ফ্রিজে রাখা বরফ জমাট পানির বোতল দিয়ে শিশুটির মাথায় একাধিকবার আঘাত করেন ওই শিক্ষক। এতে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মুগ্ধ। পরে রাতে একাধিকবার অজ্ঞান হওয়া, বমি এবং কান দিয়ে রক্ত বের হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পরিবার।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার দুপুরে খালিয়াজুরী উপজেলার রাজিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আহত মুগ্ধ মোহনগঞ্জ উপজেলার বরান্তর গ্রামের হানিফ তালুকদারের ছেলে এবং ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মুগ্ধর বাবা-মা জীবিকার তাগিদে ঢাকায় থাকেন। সে নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করে। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ের ভেতরে সহকারী শিক্ষক কাউসার আহমেদ শিক্ষার্থীদের সামান্য দুষ্টুমিকে কেন্দ্র করে ক্ষিপ্ত হয়ে মুগ্ধকে মারধর করেন। একপর্যায়ে ফ্রিজে থাকা বরফে জমাট বাঁধা পানির বোতল দিয়ে তার মাথায় একাধিকবার আঘাত করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আঘাতের পরপরই মুগ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারায়। পরে সহপাঠী ও স্থানীয় লোকজন মাথায় পানি ঢেলে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পর শিক্ষক শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়িতে কিছু না বলার নির্দেশ দেন। এমনকি বিষয়টি জানালে আবার মারধর ও পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন।
আহত শিক্ষার্থীর খালা মুক্তা খান বলেন,
“মুগ্ধর বাবা-মা এলাকায় থাকে না। আমরাই ওর দেখাশোনা করি। একটা ছোটখাটো দুষ্টুমির কারণে শিক্ষক যেভাবে বরফ জমাট বোতল দিয়ে মাথায় আঘাত করেছে, সেটা অমানবিক। সাথেসাথেই মুগ্ধ জ্ঞান হারায়। রাতে কয়েকবার অজ্ঞান হয়েছে, বমি করেছে, এমনকি কান দিয়ে রক্তও বের হয়েছে। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।”
মঙ্গলবার সকালে মুগ্ধকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থাকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. পার্থ সরকার বলেন,
“মাথায় আঘাতটি জটিল মনে হচ্ছে। রোগী রাতে বমি করেছে এবং কয়েকবার অজ্ঞান হয়েছে। এসব লক্ষণ উদ্বেগজনক। সিটি স্ক্যানসহ উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন হওয়ায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে রেফার করা হয়েছে।
এদিকে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সহকারী শিক্ষক কাউসার আহমেদ প্রায়ই শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালান। তার আচরণ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ রয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক কাউসার আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মাওলা বিষয়টি ‘সমাধানের’ কথা বলে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলছি। বিষয়টি আমরা দেখছি। সবকিছুর মধ্যে আপনারা হাত দিলে কেমনে চলবে? আগামীকাল তদন্ত হবে।
অন্যদিকে খালিয়াজুরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মো. আজিমেল কদর বলেন, “এ বিষয়ে এখনো কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। আপনার মাধ্যমেই প্রথম শুনলাম। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একজন শিক্ষকের হাতে বিদ্যালয়ের ভেতর এমন নৃশংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের দাবি, শিশুশিক্ষার্থীর ওপর হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।